• মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল ২০২৬, ০২:০৮ অপরাহ্ন
  • [gtranslate]
Headline
তিতাসে এসএসসি পরীক্ষার্থীদের দোয়া ও মিলাদ মাহফিল অনুষ্ঠিত তিতাসে অনিয়মের অভিযোগে হল সুপারসহ ৩ শিক্ষককে অব্যাহতি ও শোকজ জগতপুর সাধনা উচ্চ বিদ্যালয়ের বার্ষিক মিলাদ ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত তিতাসের বাতাকান্দিতে এসএসসি পরীক্ষার্থীদের বিদায় সংবর্ধনা অনুষ্ঠিত তিতাসে এসএসসি পরীক্ষার্থীদের দোয়া ও রহমত কামনায় মিলাদ মাহফিল অনুষ্ঠিত শিক্ষককে পরীক্ষা নয়, শিক্ষাব্যবস্থার পুনর্গঠনই সময়ের দাবি পুষ্টি, শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ: প্রাথমিক শিক্ষায় মিড-ডে মিলের অপরিহার্যতা জিগস পদ্ধতির আলোকে শ্রেণিকক্ষে কার্যকর শিখন নিশ্চিতকরণে শিক্ষকের ভূমিকা সফলতার সোপান: ভালো ছাত্র-ছাত্রীদের গুণাবলী বিঝু: পাহাড়ি সংস্কৃতির প্রাণ, নবজীবনের আহ্বান
Notice
২০২৫ শিক্ষাবর্ষে একদুয়ারিয়া উচ্চ বিদ্যালয়, মনোহরদী, নরসিংদী তে ৬ষ্ঠ থেকে ৯ম শ্রেণিতে ভর্তি চলছে।           ২০২৫ শিক্ষাবর্ষে রংপুর উচ্চ বিদ্যালয়, রংপুরে ৬ষ্ঠ থেকে ৯ম শ্রেণিতে ভর্তি চলছে।

শিক্ষককে পরীক্ষা নয়, শিক্ষাব্যবস্থার পুনর্গঠনই সময়ের দাবি

Reporter Name / ৩০ Time View
Update : বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল, ২০২৬

মোহাম্মদ শাহজামান শুভ।

 

শিক্ষার মানোন্নয়ন নিয়ে আমাদের সমাজে উদ্বেগ নতুন নয়। সময়ের সাথে সাথে এই উদ্বেগ আরও গভীর হয়েছে, বিশেষ করে যখন আমরা দেখি শিক্ষার্থীদের দক্ষতা, সৃজনশীলতা এবং বাস্তবজীবনে প্রয়োগযোগ্য জ্ঞানের ঘাটতি স্পষ্ট হয়ে উঠছে। এই প্রেক্ষাপটে প্রায়ই একটি প্রস্তাব সামনে আসে—শিক্ষকদের নিয়মিত পরীক্ষা নেওয়া। সম্প্রতি ২০ বছরে নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকদের প্রতি বছর পরীক্ষার মুখোমুখি দাঁড় করানোর প্রস্তাবও সেই ধারাবাহিকতারই অংশ। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এ ধরনের উদ্যোগ কি সত্যিই শিক্ষার মান উন্নয়নে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে, নাকি এটি কেবল সমস্যার মূল কারণ এড়িয়ে যাওয়ার একটি সহজ পথ?

প্রথমেই স্বীকার করতে হবে, শিক্ষার মান কমছে—এই অভিযোগ পুরোপুরি অমূলক নয়। তবে এই অবনতির দায় কেবল শিক্ষকের কাঁধে চাপিয়ে দেওয়া একটি সরলীকৃত এবং অনেকাংশে অবিচারপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি। শিক্ষা একটি জটিল ও বহুমাত্রিক প্রক্রিয়া, যেখানে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক, প্রশাসন, নীতি-নির্ধারক এবং অবকাঠামোগত বাস্তবতা—সবকিছু একসাথে কাজ করে। এই বহুমাত্রিক বাস্তবতাকে উপেক্ষা করে শুধুমাত্র শিক্ষককে দায়ী করা সমস্যার সমাধান নয়, বরং সমস্যাকে আরও জটিল করে তোলা।

বাংলাদেশের অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শ্রেণিকক্ষের বাস্তবতা অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। একটি কক্ষে যেখানে আদর্শভাবে ৩০-৪০ জন শিক্ষার্থী থাকার কথা, সেখানে প্রায়ই ৭০-৮০ জন বা তারও বেশি শিক্ষার্থী গাদাগাদি করে বসে থাকে। এই পরিস্থিতিতে একজন শিক্ষক যতই দক্ষ হন না কেন, প্রত্যেক শিক্ষার্থীর প্রতি প্রয়োজনীয় মনোযোগ দেওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। ফলস্বরূপ, শিক্ষাদান প্রক্রিয়া হয়ে ওঠে যান্ত্রিক, ব্যক্তিকেন্দ্রিক নয়। এই বাস্তবতায় শিক্ষকের ওপর আবার পরীক্ষার চাপ সৃষ্টি করা কতটা যৌক্তিক—তা ভেবে দেখা জরুরি।

এর পাশাপাশি রয়েছে উপকরণের অভাব। অনেক বিদ্যালয়ে এখনো পর্যাপ্ত পাঠ্যসামগ্রী, ল্যাব সুবিধা, ডিজিটাল সরঞ্জাম বা আধুনিক শিক্ষণ উপকরণ নেই। অথচ বর্তমান বিশ্বে শিক্ষা ক্রমেই প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উঠছে। যেখানে উন্নত বিশ্বে শিক্ষার্থীরা স্মার্ট বোর্ড, ইন্টারঅ্যাকটিভ কনটেন্ট এবং ভার্চুয়াল ল্যাবের মাধ্যমে শিখছে, সেখানে আমাদের অনেক শিক্ষক এখনও ব্ল্যাকবোর্ড ও চকেই সীমাবদ্ধ। এই বৈষম্যমূলক অবস্থায় শিক্ষকের কাছ থেকে বিশ্বমানের ফলাফল প্রত্যাশা করা বাস্তবতার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।

প্রশিক্ষণের বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন শিক্ষক শুধু নিয়োগপ্রাপ্ত হলেই তার দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না; বরং শিক্ষাজীবনের প্রতিটি ধাপে তাকে নতুন জ্ঞান, নতুন কৌশল এবং নতুন পদ্ধতির সাথে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে হয়। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষক প্রশিক্ষণ হয় অনিয়মিত, অপ্রাসঙ্গিক কিংবা শুধুমাত্র আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ। ফলস্বরূপ, শিক্ষকরা তাদের দক্ষতা উন্নয়নের পর্যাপ্ত সুযোগ পান না। এই ঘাটতি পূরণ না করে তাদের ওপর পরীক্ষা চাপিয়ে দেওয়া কার্যত সমস্যার সমাধান নয়।

শিক্ষাক্রম বা কারিকুলামের ক্ষেত্রেও রয়েছে নানা সীমাবদ্ধতা। এখনও অনেক ক্ষেত্রে মুখস্থনির্ভর শিক্ষা পদ্ধতি প্রাধান্য পাচ্ছে, যেখানে সৃজনশীলতা, সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা এবং সমস্যা সমাধানের দক্ষতা যথাযথ গুরুত্ব পায় না। একজন শিক্ষক যদি এমন একটি কাঠামোর মধ্যে কাজ করেন, যেখানে শিক্ষার্থীর সৃজনশীল বিকাশের সুযোগ সীমিত, তাহলে তার ওপর পরীক্ষার মাধ্যমে দক্ষতা যাচাই কতটা কার্যকর হবে—তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।

এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো শিক্ষকের পেশাগত মর্যাদা ও কাজের পরিবেশ। একজন শিক্ষক প্রতিদিন যে চাপের মধ্যে কাজ করেন, তা অনেক সময়ই দৃশ্যমান নয়। শিক্ষার্থীর প্রশ্ন, অভিভাবকের প্রত্যাশা, প্রশাসনিক দায়িত্ব, সামাজিক চাপ—সব মিলিয়ে তার প্রতিটি দিনই যেন একটি চলমান পরীক্ষা। এই বাস্তবতায় তাকে আবার কাগুজে পরীক্ষার মুখোমুখি দাঁড় করানো মানে তার মানসিক চাপ আরও বাড়িয়ে দেওয়া, যা দীর্ঘমেয়াদে শিক্ষার মানোন্নয়নের জন্য সহায়ক নয়।

বরং প্রয়োজন একটি সমন্বিত ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি। শিক্ষার উন্নয়ন চাইলে প্রথমেই আমাদের সিস্টেমের দিকে নজর দিতে হবে। শ্রেণিকক্ষকে হতে হবে শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক, যেখানে প্রতিটি শিক্ষার্থী তার নিজস্ব গতিতে শেখার সুযোগ পায়। শিক্ষকদের জন্য নিয়মিত, কার্যকর এবং প্রাসঙ্গিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে তারা নতুন শিক্ষণ পদ্ধতি ও প্রযুক্তির সাথে নিজেদের দক্ষতা বৃদ্ধি করতে পারেন।

এছাড়া শিক্ষকদের জন্য একটি সহায়ক পরিবেশ তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি। তাদের কাজের স্বীকৃতি, পেশাগত নিরাপত্তা এবং মর্যাদা নিশ্চিত করতে হবে। একজন শিক্ষক যদি নিজেকে সম্মানিত ও নিরাপদ মনে করেন, তাহলে তার কর্মদক্ষতা ও দায়বদ্ধতা স্বাভাবিকভাবেই বৃদ্ধি পাবে। অন্যদিকে, অবিশ্বাস ও চাপের পরিবেশে সৃজনশীলতা বিকাশ লাভ করে না।

পরীক্ষার ধারণাটি সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয়—এমন বলা হচ্ছে না। কিন্তু এই পরীক্ষা হতে হবে সহায়ক, উন্নয়নমূলক এবং গঠনমূলক—শাস্তিমূলক বা চাপসৃষ্টিকারী নয়। শিক্ষককে মূল্যায়নের পরিবর্তে তাকে দিকনির্দেশনা দেওয়া, তার দুর্বলতা চিহ্নিত করে উন্নয়নের সুযোগ তৈরি করা—এই দৃষ্টিভঙ্গিই হতে পারে অধিক কার্যকর।

সবশেষে বলা যায়, শিক্ষা একটি জাতির মেরুদণ্ড, আর সেই মেরুদণ্ডকে শক্তিশালী করতে হলে শিক্ষককে শক্তিশালী করা অপরিহার্য। শিক্ষককে দুর্বল রেখে, তাকে কেবল পরীক্ষার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করে একটি শক্তিশালী শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব নয়। প্রয়োজন সহমর্মিতা, দূরদর্শিতা এবং বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা।

অতএব, সময় এসেছে আমরা প্রশ্নটি নতুনভাবে ভাবি—শিক্ষককে বারবার পরীক্ষার মুখোমুখি দাঁড় করালে নয়, বরং তাকে যথাযথ সহায়তা, প্রশিক্ষণ ও সম্মান প্রদান করলেই শিক্ষার প্রকৃত আলোকিত পথ উন্মুক্ত হবে।

 


আপনার মতামত লিখুন :
More News Of This Category

অভিনন্দন! দ্যা রয়েল কমনওয়েলথ রচনা প্রতিযোগিতায় পুরস্কার অর্জন করার জন্য