মোহাম্মদ শাহজামান শুভ
পাঁচ বছর বয়সে যখন একটি শিশু প্রথমবারের মতো বিদ্যালয়ের গণ্ডিতে পা রাখে, তখন তার জীবনে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা ঘটে। এই সময়টিই শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়। খেলাধুলা, দৌড়ঝাঁপ, নতুন বন্ধুদের সঙ্গে মেলামেশা এবং নিয়মিত পাঠ গ্রহণ—সব মিলিয়ে এই বয়সে শিশুর শক্তি ও পুষ্টির চাহিদা দ্রুত বৃদ্ধি পায়। তাই সঠিক পুষ্টির অভাব হলে তার শারীরিক বৃদ্ধি যেমন বাধাগ্রস্ত হয়, তেমনি মানসিক বিকাশও ব্যাহত হয়। এই প্রেক্ষাপটে শিশুর দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন ও ফ্যাটের সুষম উপস্থিতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কার্বোহাইড্রেট শিশুর শক্তির প্রধান উৎস। ভাত, রুটি, নুডলস, আলু ইত্যাদি খাদ্য থেকে সহজেই কার্বোহাইড্রেট পাওয়া যায় এবং এগুলো দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় থাকলে শক্তির চাহিদা পূরণ হয়। তবে শুধুমাত্র শক্তি থাকলেই যথেষ্ট নয়; শিশুর দেহ গঠন, কোষের বৃদ্ধি এবং বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের জন্য প্রয়োজন প্রোটিন। বাস্তবতা হলো, আমাদের দেশের অনেক শিশুই প্রোটিনের ঘাটতিতে ভোগে। মাছ, মাংস, ডাল, সয়াবিন, শাক-সবজি—এই সব খাবারে প্রোটিন থাকলেও দরিদ্র পরিবারের অনেক শিশুর নাগালের বাইরে থেকে যায় এসব পুষ্টিকর খাদ্য। ফলে অপুষ্টি তাদের নিত্যসঙ্গী হয়ে দাঁড়ায়।
শিশুরা সাধারণত বেশি চঞ্চল হয় এবং তাদের শক্তির প্রয়োজনও বেশি থাকে। এজন্য প্রতিদিন একটি বা দুটি ডিম খাওয়ানো তাদের জন্য অত্যন্ত উপকারী। ডিম একটি সহজলভ্য ও উচ্চমানের প্রোটিনসমৃদ্ধ খাদ্য, যা শিশুর মেধা বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু দেশের বাস্তবতায় সব পরিবার নিয়মিতভাবে শিশুকে পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবার দিতে সক্ষম নয়। ফলে স্কুলে আসা অনেক শিশুই ক্ষুধার্ত অবস্থায় ক্লাস করে, যা তাদের মনোযোগ ও শেখার ক্ষমতাকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করে।
এই পরিস্থিতিতে প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় মিড-ডে মিল বা স্কুল ফিডিং কর্মসূচি একটি যুগান্তকারী উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এটি শুধু একটি খাবার সরবরাহের কর্মসূচি নয়; বরং এটি একটি সামাজিক বিনিয়োগ, যা একটি দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুস্থ, মেধাবী ও কর্মক্ষম করে গড়ে তুলতে সহায়তা করে।
মিড-ডে মিল কর্মসূচির সবচেয়ে বড় সুফল হলো শিক্ষার্থীদের স্কুলে উপস্থিতি বৃদ্ধি। দরিদ্র পরিবারের অনেক শিশু শুধুমাত্র একটি বেলার খাবারের আশায় স্কুলে আসে। ফলে তাদের নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত হয়। একসময় যারা নানা কারণে স্কুলে যাওয়া থেকে বিরত থাকত, তারা এখন নিয়মিত ক্লাসে অংশগ্রহণ করছে। এটি শিক্ষার প্রসারে একটি বড় ইতিবাচক পরিবর্তন।
শুধু উপস্থিতি বৃদ্ধি নয়, মিড-ডে মিল শিক্ষার্থীদের মনোযোগ ও মেধার বিকাশেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ক্ষুধার্ত অবস্থায় একটি শিশু কখনোই মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করতে পারে না। পুষ্টিকর খাবার গ্রহণের ফলে তাদের মস্তিষ্ক সঠিকভাবে কাজ করতে পারে এবং তারা পাঠে মনোযোগী হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব শিক্ষার্থী নিয়মিত পুষ্টিকর খাবার পায়, তারা পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করে এবং তাদের শেখার আগ্রহও বেশি থাকে।
এছাড়া এই কর্মসূচি শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া বা ড্রপ-আউটের হার কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অনেক দরিদ্র পরিবারে শিশুরা অল্প বয়সেই কাজ করতে বাধ্য হয়। কিন্তু স্কুলে যদি খাবারের নিশ্চয়তা থাকে, তাহলে অভিভাবকরা তাদের সন্তানকে স্কুলে পাঠাতে উৎসাহিত হন। ফলে শিশুরা প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করার সুযোগ পায়, যা তাদের ভবিষ্যৎ জীবনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
পুষ্টিহীনতা আমাদের দেশের একটি বড় সমস্যা, বিশেষ করে গ্রামীণ ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে। মিড-ডে মিল কর্মসূচি এই সমস্যার সমাধানে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। প্রতিদিন স্কুলে পুষ্টিকর খাবার সরবরাহের মাধ্যমে শিশুদের অপুষ্টিজনিত সমস্যা অনেকাংশে কমানো সম্ভব। এতে তাদের শারীরিক বৃদ্ধি স্বাভাবিক থাকে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও বৃদ্ধি পায়।
সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকেও এই কর্মসূচির গুরুত্ব অপরিসীম। যখন ধনী ও দরিদ্র সব শিশুই একসঙ্গে বসে একই খাবার গ্রহণ করে, তখন তাদের মধ্যে সমতা ও ভ্রাতৃত্ববোধ গড়ে ওঠে। এটি সমাজে বৈষম্য কমাতে সহায়তা করে এবং একটি মানবিক সমাজ গঠনে ভূমিকা রাখে। শিশুদের মধ্যে এই মূল্যবোধ গড়ে উঠলে তারা বড় হয়ে আরও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠবে।
বাংলাদেশ বর্তমানে একটি উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত ও ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ গড়ার যে স্বপ্ন আমরা দেখি, তা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন সুস্থ, শিক্ষিত ও দক্ষ মানবসম্পদ। এই লক্ষ্য অর্জনে মিড-ডে মিল কর্মসূচি একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হতে পারে। কারণ একটি সুস্থ শিশু মানেই একটি সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ।
তবে এই কর্মসূচি বাস্তবায়নে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। যেমন—খাবারের মান বজায় রাখা, সঠিকভাবে বিতরণ নিশ্চিত করা, দুর্নীতি ও অপচয় রোধ করা ইত্যাদি। এসব সমস্যা সমাধানের জন্য প্রয়োজন কার্যকর পরিকল্পনা, নিয়মিত তদারকি এবং স্থানীয় জনগণের সম্পৃক্ততা। স্কুল ব্যবস্থাপনা কমিটি, অভিভাবক ও স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগ এই কর্মসূচিকে আরও সফল করে তুলতে পারে।
এছাড়া খাবারের মেনুতে বৈচিত্র্য আনা প্রয়োজন, যাতে শিশুদের একঘেয়েমি না আসে এবং তারা আগ্রহ নিয়ে খাবার গ্রহণ করে। পুষ্টিবিদদের পরামর্শ অনুযায়ী খাদ্যতালিকা তৈরি করলে শিশুদের পুষ্টির চাহিদা আরও ভালোভাবে পূরণ করা সম্ভব।
সবশেষে বলা যায়, একটি দেশের উন্নয়ন নির্ভর করে তার ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর। সেই প্রজন্ম যদি অপুষ্টি ও অশিক্ষার শিকার হয়, তাহলে উন্নয়নের স্বপ্ন কখনোই পূরণ হবে না। তাই প্রাথমিক শিক্ষায় মিড-ডে মিল কর্মসূচি শুধু একটি সামাজিক সেবা নয়, বরং এটি একটি জাতীয় প্রয়োজন।
শিশুদের পুষ্টি নিশ্চিত করা মানেই তাদের শিক্ষা নিশ্চিত করা, আর শিক্ষা নিশ্চিত করা মানেই একটি সমৃদ্ধ জাতি গড়ে তোলা। তাই এখনই সময় এই কর্মসূচিকে আরও বিস্তৃত ও কার্যকর করার, যাতে দেশের প্রতিটি শিশুই সুস্থভাবে বেড়ে উঠতে পারে এবং একটি উজ্জ্বল ভবিষ্যতের পথে এগিয়ে যেতে পারে।
লেখকঃ শিক্ষক ও লেখক।