• মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:০৩ পূর্বাহ্ন
  • [gtranslate]
Headline
জিগস পদ্ধতির আলোকে শ্রেণিকক্ষে কার্যকর শিখন নিশ্চিতকরণে শিক্ষকের ভূমিকা সফলতার সোপান: ভালো ছাত্র-ছাত্রীদের গুণাবলী বিঝু: পাহাড়ি সংস্কৃতির প্রাণ, নবজীবনের আহ্বান কালীগঞ্জের আসিফ ইসলামের জাতীয় কুরআন তেলাওয়াতে প্রথম স্থান মেধাবী শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা দিয়ে উৎসাহিত করলো বাংলাদেশ কিন্ডারগার্টেন এসোসিয়েশন দাউদকান্দির গৌরীপুরে সাহিত্যজাগরণের উৎসব: অনুশীলন লেখক পরিষদ বাংলাদেশের স্বপ্নযাত্রা সম্মেলন ২০২৬ হাইব্রিড শিক্ষার নতুন দিগন্ত: যানজট, জ্বালানি সাশ্রয় ও প্রযুক্তিনির্ভর বাংলাদেশের স্বপ্ন নতুন দিনের অঙ্গীকার, স্কাউটিং হোক সবার শিক্ষকের জীবনমান, কোচিং-নির্ভরতা ও শিক্ষাক্রমের সংকট: বাংলাদেশের শিক্ষা বাস্তবতার এক নির্মম প্রতিচ্ছবি বিশ্ব জুড়ে বাজিমাত ফাতেমার ‘কিডস স্পেশাল আচার’
Notice
২০২৫ শিক্ষাবর্ষে একদুয়ারিয়া উচ্চ বিদ্যালয়, মনোহরদী, নরসিংদী তে ৬ষ্ঠ থেকে ৯ম শ্রেণিতে ভর্তি চলছে।           ২০২৫ শিক্ষাবর্ষে রংপুর উচ্চ বিদ্যালয়, রংপুরে ৬ষ্ঠ থেকে ৯ম শ্রেণিতে ভর্তি চলছে।

নীলিমার ডাকে দক্ষিণে

Reporter Name / ৪৭৪ Time View
Update : সোমবার, ২২ ডিসেম্বর, ২০২৫

মোহাম্মদ শাহজামান শুভ।

 

ফেব্রুয়ারির সেই স্নিগ্ধ সকালটি আজও স্মৃতির মণিকোঠায় এক অপার্থিব দীপ্তি ছড়িয়ে দেয়। সময়ের ঘড়ি যতই সামনে এগিয়ে যাক, ২০২১ সালের ৮ই ফেব্রুয়ারির সেই ভোর যেন মনে পড়ে এক অনন্ত বর্তমানের মতো। সেদিন তিতাস উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা আইসিটি কমিটির সকল সদস্য একত্র হয়েছিলাম একটি আনন্দ ভ্রমণের উদ্দেশ্যে, কিন্তু অজান্তেই সেটি যে আনন্দের চেয়েও বড় কিছু হয়ে উঠবে, তা তখন কেউই পুরোপুরি বুঝতে পারিনি। প্রতিদিনের বাঁধাধরা রুটিন, শ্রেণিকক্ষের পাঠপরিকল্পনা, দাপ্তরিক কাজের চাপ আর যান্ত্রিক জীবনের ক্লান্তি পেছনে ফেলে আমরা যাত্রা শুরু করেছিলাম প্রকৃতির কোলে কিছুদিন হারিয়ে যাওয়ার বাসনায়। হৃদয়ের গভীরে তখন অজানাকে জানার এক ব্যাকুল তৃষ্ণা, যেন বহুদিনের জমে থাকা অবসাদ ধুয়ে-মুছে নিয়ে যাবে দক্ষিণের নীল জলধি।

বাসের জানালা দিয়ে ভোরের আলো ছড়িয়ে পড়ছিল ধানক্ষেত আর গ্রামের কাঁচা-পাকা পথের ওপর। কোথাও শিশুরা স্কুলে যাচ্ছে, কোথাও কৃষক মাঠে নেমে পড়েছে, আবার কোথাও নদীর ধারে নৌকা বাঁধা—এই চেনা দৃশ্যগুলোর মাঝেই আমরা অচেনার দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলাম। সহযাত্রী শিক্ষক বন্ধুদের হাসি-আড্ডা, মাঝেমধ্যে নীরব হয়ে প্রকৃতির দিকে তাকিয়ে থাকা—সব মিলিয়ে যাত্রাপথেই তৈরি হচ্ছিল এক ভিন্ন আবহ। ঢাকা থেকে প্রায় ৩৮০ কিলোমিটার আর বরিশাল থেকে ১০৮ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত আমাদের গন্তব্য পটুয়াখালী জেলার কলাপাড়া উপজেলার কুয়াকাটা—নামটি উচ্চারণ করলেই যেন নীল আকাশ আর সাগরের গর্জন একসাথে ভেসে ওঠে।

দীর্ঘ পথ পেরিয়ে যখন দক্ষিণের বাতাসে লবণের হালকা গন্ধ মিশে এলো, তখন শরীরের ক্লান্তি অজান্তেই উধাও হয়ে গেল। মনে হচ্ছিল প্রকৃতি নিজ হাতে আমাদের স্বাগত জানাচ্ছে। কুয়াকাটায় পৌঁছে প্রথম যে অনুভূতিটা হয়েছিল, তা হলো প্রশান্তি—এক গভীর, নির্ভার প্রশান্তি। চারপাশে ছড়িয়ে থাকা নীল জলরাশি, আকাশ আর সাগরের মিলনরেখা, দূরের ঢেউয়ের নীরব ডাক—সব মিলিয়ে মনে হচ্ছিল, আমরা যেন হঠাৎ করেই শহুরে কোলাহল পেরিয়ে এক অন্য জগতে এসে পড়েছি।

কুয়াকাটা কেবল একটি সমুদ্র সৈকত নয়, এটি ইতিহাসের এক জীবন্ত দলিল। এই ভূমির প্রতিটি বালুকণায় লুকিয়ে আছে মানুষের টিকে থাকার গল্প, বেদনা আর আশার কথা। আঠারো শতকে মুঘল শাসকদের নিপীড়নে বার্মা থেকে বিতাড়িত হয়ে আসা আরাকানি জনগোষ্ঠী এই উপকূলে আশ্রয় নিয়েছিল। নোনা জল আর অনাবৃত ভূমির মাঝে সুপেয় পানির তৃষ্ণা মেটাতে তারা একের পর এক কুয়া বা কূপ খনন করেছিল। সেই কুয়াগুলোর স্মৃতিই বহন করে আজকের কুয়াকাটা নাম। ইতিহাসের এই গল্প শুনে এবং নিজ চোখে প্রাচীন কুয়ার অস্তিত্ব দেখে আমাদের ভ্রমণ যেন আরও গভীর অর্থ পেল। মনে হলো, আমরা শুধু প্রকৃতি দেখছি না, সময়ের দীর্ঘ স্রোতের ভেতর দিয়েও হাঁটছি।

সমুদ্রের তীরে প্রথম দাঁড়ানোর মুহূর্তটি ছিল আবেগে ভরা। কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতের বিস্তৃত বালুকাবেলা যেন আমাদের দুই হাত মেলে গ্রহণ করল। ১৮ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সৈকতের ঢেউয়ে কোনো হিংস্রতা নেই, আছে এক শান্ত, মায়াবী ছন্দ। দিগন্তজোড়া নীল জলরাশি আর ফেনিল ঢেউয়ের শব্দে এক ধরনের আধ্যাত্মিক প্রশান্তি ছড়িয়ে পড়ছিল। তখনই বুঝলাম কেন কুয়াকাটাকে ‘সাগরকন্যা’ বলা হয়। এখানে দাঁড়িয়ে মনে হয়, সাগর যেন মানুষের সমস্ত ক্লান্তি নিজের বুকে টেনে নেয়।

কুয়াকাটার বিশেষত্ব হলো এখান থেকে সূর্যোদয় আর সূর্যাস্ত—দুটোই দেখা যায়। ভোরের আলোয় সাগরের বুক চিরে যখন রক্তিম সূর্য ধীরে ধীরে উঠে আসে, তখন মনে হয় নতুন করে জন্ম নিচ্ছে দিন। আবার সন্ধ্যার সময় সোনালি আভা ছড়িয়ে সূর্য যখন জলের গভীরে তলিয়ে যায়, তখন সেই দৃশ্য ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। আমরা নীরবে দাঁড়িয়ে সেই রূপ উপভোগ করেছিলাম, যেন কথা বললে মুহূর্তটি ভেঙে যাবে।

ভ্রমণের অন্যতম রোমাঞ্চকর অধ্যায় ছিল নদী ভ্রমণ। নৌকায় চড়ে নদীর বুক দিয়ে এগিয়ে যাওয়ার সময় চারপাশের দৃশ্য মনে হচ্ছিল জীবন্ত এক ক্যানভাস। দুই তীরের জনজীবন, জেলেদের ব্যস্ততা, নদীর জলে সূর্যের ঝিলিক—সব মিলিয়ে সময় যেন কিছুক্ষণের জন্য থেমে গিয়েছিল। নদীর ঢেউয়ের সাথে তাল মিলিয়ে আমাদের মনও দুলছিল। এই নদীপথেই আমরা পৌঁছালাম ফাতরার বনে। সমুদ্রসৈকতের পশ্চিম দিকে অবস্থিত এই সংরক্ষিত ম্যানগ্রোভ বনকে অনেকে ‘দ্বিতীয় সুন্দরবন’ বলে থাকেন। বনের ভেতরে ঢুকতেই চারপাশে নেমে এলো এক গভীর নিস্তব্ধতা। গাছের শ্বাসমূল, লবণাক্ত বাতাস আর পাখির ডাক—সব মিলিয়ে প্রকৃতি যেন এখানে নিজের ভাষায় কথা বলে।

পরের দিনগুলোতে কুয়াকাটার ইতিহাস আর সংস্কৃতির সাথে আমাদের পরিচয় আরও গভীর হলো। সীমা বৌদ্ধ বিহারে গিয়ে প্রায় সাঁইত্রিশ মন ওজনের অষ্টধাতুর তৈরি ধ্যানমগ্ন বুদ্ধমূর্তির সামনে দাঁড়িয়ে এক অপার্থিব শান্তি অনুভব করলাম। সেই মূর্তির চোখে যেন শতাব্দীর ধ্যান, সহিষ্ণুতা আর মানবতার বার্তা লুকিয়ে আছে। কাছেই থাকা রাখাইন পল্লী কেরানিপাড়ায় গিয়ে সেখানকার মানুষের জীবনযাত্রা, সংস্কৃতি আর তাঁতশিল্প দেখে মুগ্ধ হলাম। আধুনিকতার প্রবল স্রোতের মাঝেও তারা কীভাবে নিজেদের ঐতিহ্য আগলে রেখেছে, তা আমাদের নতুন করে ভাবতে শেখাল।

মিশ্রিপাড়া বৌদ্ধ বিহারে উপমহাদেশের সবচেয়ে বড় বৌদ্ধ মূর্তিটি দর্শন ছিল আমাদের সফরের আরেকটি অনন্য অভিজ্ঞতা। বিশালত্বের মাঝেও সেখানে ছিল এক অপূর্ব শান্ত ভাব, যা মনকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। এরপর আলীপুর ও মহিপুর মৎস্য বন্দরে গিয়ে আমরা দেখলাম দক্ষিণাঞ্চলের কর্মচঞ্চল জীবন। রুপালি ইলিশের ঝিলিক, জেলেদের হাঁকডাক, নৌকার সারি—সব মিলিয়ে জীবনের এক ভিন্ন স্পন্দন অনুভব করলাম। গঙ্গামতির খালের পাশে গজমতির জঙ্গলও আমাদের টেনেছিল তার রহস্যময় সৌন্দর্যে।

এই চার দিনে কুয়াকাটা আমাদের শিখিয়েছে ধীরে চলতে, মন দিয়ে দেখতে, প্রকৃতির সাথে সংলাপ করতে। এখানে প্রকৃতি আর মানুষ একে অপরের সাথে মিশে আছে অবিচ্ছেদ্যভাবে। ১১ই ফেব্রুয়ারি যখন আমাদের ভ্রমণের সমাপ্তি ঘটল, তখন মনে হচ্ছিল আমরা কেবল কয়েকটি দর্শনীয় স্থান ঘুরে দেখিনি, বরং নিজেদের ভেতরেও একটি দীর্ঘ যাত্রা সম্পন্ন করেছি। শিক্ষা আর আনন্দের এই অপূর্ব মেলবন্ধন আমাদের আইসিটি কমিটির সকল সদস্যের হৃদয়ে চিরস্থায়ী ছাপ রেখে গেছে। কুয়াকাটার সাগর, বন, মানুষ আর ইতিহাস—সব মিলিয়ে সেই দিনগুলো আজও মনে পড়ে এক পশলা নরম বৃষ্টির মতো, যা ক্লান্ত জীবনে বারবার নেমে এসে মনকে শীতল করে দেয়।

লেখকঃ শিক্ষক ও লেখক

 


আপনার মতামত লিখুন :
More News Of This Category

অভিনন্দন! দ্যা রয়েল কমনওয়েলথ রচনা প্রতিযোগিতায় পুরস্কার অর্জন করার জন্য