ব্লুমের রিভাইজড ট্যাক্সোনমি: শিক্ষণ ও মূল্যায়নের একটি আধুনিক এবং কার্যকর কাঠামো
শিক্ষা গবেষণা ও উন্নয়ন ডেস্ক, আলোধারা।
ভূমিকা একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় মুখস্থনির্ভর শিক্ষা থেকে বেরিয়ে এসে শিক্ষার্থীদের চিন্তন দক্ষতা বা ‘Thinking Skills’ বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই। এই লক্ষ্য অর্জনে সারা বিশ্বে শিক্ষাবিদদের কাছে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য এবং বৈজ্ঞানিক কাঠামোটি হলো ‘ব্লুমের ট্যাক্সোনমি’ (Bloom’s Taxonomy)। বিশেষ করে, ২০০১ সালে লরিন অ্যান্ডারসন এবং ডেভিড ক্রাথহোল কর্তৃক পরিমার্জিত সংস্করণটি বা ‘ব্লুমের রিভাইজড ট্যাক্সোনমি’ বর্তমান সৃজনশীল ও যোগ্যতাভিত্তিক শিক্ষাক্রমের মূল ভিত্তি। আজকের প্রতিবেদনে আমরা এই কাঠামোর আদ্যোপান্ত এবং শ্রেণিকক্ষে এর সঠিক প্রয়োগ নিয়ে আলোচনা করব।
প্রেক্ষাপট ও ইতিহাস: ১৯৫৬ সালে শিক্ষাবিদ বেঞ্জামিন ব্লুম শিক্ষার উদ্দেশ্যগুলোকে শ্রেণিবিন্যাস করার জন্য একটি কাঠামো তৈরি করেন, যা ‘ব্লুমস ট্যাক্সোনমি’ নামে পরিচিত। দীর্ঘ ৪৫ বছর পর, ২০০১ সালে ব্লুমের ছাত্র লরিন অ্যান্ডারসন এবং সহযোগী ডেভিড ক্রাথহোল এটিকে আরও যুগোপযোগী করেন।
জ্ঞানীয় ডোমেইন: চিন্তন দক্ষতার ৬টি স্তর: ব্লুমের রিভাইজড ট্যাক্সোনমি শিক্ষার্থীদের চিন্তন দক্ষতাকে নিচ থেকে উপরের দিকে মোট ৬টি স্তরে ভাগ করে। একজন শিক্ষার্থীকে নিম্নতর চিন্তন দক্ষতা থেকে ক্রমান্বয়ে উচ্চতর চিন্তন দক্ষতার দিকে ধাবিত করাই এর মূল লক্ষ্য।
ধাপ-১: স্মরণ করা (Remembering) এটি চিন্তন দক্ষতার সর্বনিম্ন স্তর। এখানে শিক্ষার্থী পূর্বে শেখা তথ্য হুবহু মনে করতে বা স্মরণ করতে পারে।
ধাপ-২: অনুধাবন করা (Understanding) তথ্যটি কেবল মুখস্থ না করে তার অর্থ বোঝা। শিক্ষার্থী নিজের ভাষায় বিষয়টি ব্যাখ্যা করতে পারে।
ধাপ-৩: প্রয়োগ করা (Applying) অর্জিত জ্ঞান বা ধারণাকে নতুন কোনো পরিস্থিতিতে ব্যবহার করা। এটি তাত্ত্বিক জ্ঞানকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার ধাপ।
ধাপ-৪: বিশ্লেষণ করা (Analyzing) কোনো জটিল বিষয়কে ভেঙে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশে বিভক্ত করা এবং অংশগুলোর মধ্যে সম্পর্ক নির্ণয় করা।
ধাপ-৫: মূল্যায়ন করা (Evaluating) কোনো নির্দিষ্ট মানদণ্ডের ভিত্তিতে কোনো ধারণা বা কাজের বিচার করা বা মতামত দেওয়া। এখানে শিক্ষার্থীকে যুক্তি দিয়ে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করতে হয়।
ধাপ-৬: সৃজন করা (Creating) এটি চিন্তন দক্ষতার সর্বোচ্চ স্তর। পূর্বের সকল জ্ঞান ও দক্ষতা কাজে লাগিয়ে সম্পূর্ণ নতুন কিছু তৈরি করা।
জ্ঞানের মাত্রা (The Knowledge Dimension): রিভাইজড ট্যাক্সোনমি শুধুমাত্র চিন্তন প্রক্রিয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি জ্ঞানের প্রকারভেদকেও চারটি ভাগে ভাগ করেছে:
শ্রেণিকক্ষে ও মূল্যায়নে এর গুরুত্ব: বাংলাদেশের বর্তমান শিক্ষাক্রম এবং সৃজনশীল প্রশ্নপদ্ধতি বা ধারাবাহিক মূল্যায়ন—সবকিছুর মূলে রয়েছে এই ট্যাক্সোনমি।
উপসংহার: ‘আলোধারা’ মনে করে, মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে হলে ব্লুমের রিভাইজড ট্যাক্সোনমি কেবল তাত্ত্বিক বইয়ের পাতায় থাকলে চলবে না, একে নিয়ে আসতে হবে শ্রেণিকক্ষের প্রতিটি কোণায়। যখন একজন শিক্ষার্থী কেবল তথ্যের ধারক না হয়ে তথ্যের বিশ্লেষক এবং নতুন জ্ঞানের স্রষ্টা হিসেবে গড়ে উঠবে, তখনই সার্থক হবে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা।